|
ডিজিটাল বাগেরহাট করার অঙ্গীকার নিয়ে শেষ হলো জ্ঞান উৎসব ২০২১ সালের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ তথা একটি জ্ঞানভিত্তিক দেশ গড়ার কর্মকান্ড শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে। সেই কাজেরই একটি বড়ো অংশ হলো তথ্য প্রযুক্তিকে সবখানে ছড়িয়ে দেওয়ার নানা আয়োজন। এমনই একটি আয়োজন হয়ে গেল ২ ও ৩ তারিখে দক্ষিণের জেলাবাগেরহাটে। তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল প্রযুক্তিকে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ তৈরির জন্য নানামূখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে হিসাবে সফলভাবে সমাপ্ত হলো 'জ্ঞান উৎসব২০০৯: বাগেরহাট হবে ডিজিটাল' । দুইদিনের নানা আয়োজনের মাধ্যমে বাগেরহাট জেলাকে উন্নত করার কর্মকাণ্ড শুরু হলো। আমাদের গ্রাম - উন্নয়নের জন্য তথ্য প্রযুক্তি প্রকল্প ছিল এই আয়োজনের মূল উদ্যোক্তা। বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও বাগেরহাট প্রেস ক্লাবের সার্বিক সহযোগিতায় দুইদিনব্যাপী আয়োজনের সহ-আয়োজক বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে বাগেরহাটের পাঁচটি স্থানে উৎবের নানা আয়োজন হয়েছে। প্রাক উৎসব উৎসবের প্রস্তুতি কর্মযঙ্গের মধ্যে ১ অক্টোবর হয়ে যায় তরুনদের জন্য দাবা ও ক্যারম প্রতিযোগিতা। বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত আমাদের গ্রামের দুইটি কার্যালয়ে নিজেদের শ্রেষ্টত্বের লড়াই-এ অংশ নিয়েছে বাগেরহাটের শিক্ষার্থীরা। সেদিন এমনিতে সরগরম ছিল উৎসব সচিবালয়। উৎসবের প্রথম দিন
২ তারিখ সকালে উৎসবের শোভাযাত্রায় অংশ নেওয়া সকলের ভাষ্যমতে শোভাযাত্রাটি ছিল সাম্প্রতিক কালের সবচেয়ে বড়ো শোভাযাত্রা। শহীদমিনার থেকে উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করেন বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান। তার সঙ্গে ছিলেন খুলনা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, বাগেরহাটের তিন সংসদ সদস্য মীর শওকত আলী, হাবিবুন নাহার তালুকদার ও মোজাম্মেল হোসেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, অধ্যাপক লুৎফুজ্জামান, পৌরসভা ও উপজেলার চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোস্তফা জব্বার, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ টিআইএম নূরুল কবীর, আহমেদ হাসান জুয়েল, ডিনেটের পরিচালক অনন্য রায়হান, রূপান্তরের স্বপন গুহ, প্রথম আলোর সহকারি সম্পাদক পল্লব মোহায়মেনসহ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও স্থানীয় জনগণ। এটি শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে শহরের কয়েকটি সড়ক ঘুরে মূল উৎসব স্থল স্থানীয় স্বাধীনতা উদ্যানে এসে শেষ হয়। সেখানে ফিতা কেটে প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন উৎসবের প্রধান অতিথি। মূল উৎসব মঞ্চে এরপর শুরু স্বপ্নের বাগেরহাট ও ডিজিটাল সেমিনার। ইন্টেল ও বিটিএনের পৃষ্ঠপোষকতায় এই সেমিনার সঞ্চালকের দায়িত্বপালন করেন অধ্যাপক জাফর ইকবাল। সূত্রধরের কাজটি করের গণিত অলিম্পয়াডের সাধারণ সম্পাদক। আলোটনায় অংশ নেন সকল সাংসদ, মেয়র, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ প্রমূখ। সেমিনারে সবাইকে স্বাগত জানান আমাদের গ্রাম প্রকল্পের পরিচালক রেজা সেলিম। এতে প্রধান অতিথি স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, যার যা আছে তা নিয়েই ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে দেশকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এভাবেই গড়ে উঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশ। সেমিনারে সঞ্চালক অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল বাংলাদেশের দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশি পরমাণুবিজ্ঞানীদের দিয়ে চালু করার আহ্বান জানান। জনপ্রতিনিধিরা সবাই এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোস্তাফা জব্বার দ্রুত দ্বিতীয় সাবমেরিন ক্যাবলের সঙ্গে দেশকে যুক্ত করার আহবান জানান। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসাইন, পুলিশ সুপার মো. মীজানুর রহমান, বাগেরহাটের মেয়র খান হাবিবুর রহমান এতে বক্তৃতা করেন। সেমিনার শেষে বাগেরহাট জেলা প্রশাসন ও স্থানীয় প্রেসক্লাবের ওয়েবসাইট (www.dcbagerhat.gov.bd ও www.bagerhatpressclub.com) উদ্বোধন করা হয়।
সকাল ১০টা থেকে বাগেরহাট বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় ও আদর্শ বিদ্যা নিকেতনে শিক্ষার্থীদের জন্য শুরু হয় গণিত অলিম্পয়াড। ৪টি ক্যাটাগরিতে সহস্রাধিক শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় দুইটি স্থানে এবং দুইটি পৃথক ব্যাচে অলিম্পিয়াডের আয়োজন করতে হয়! অলিম্পিয়াড শেষে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ যোগ দেয় তাদের জন্য এক মজদার শিক্ষামূলক কার্যক্রমে। বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের মুভার্স কামরুল ও অভিক তাদের সামনে তুলে ধরে সংখ্যার এক আশ্চর্য সুন্দর জগৎ। ঘুরে ফের আলোচনায় আসে একমাত্র জোড় মৌলিক সংখ্যা, সংখ্যা ১১ এর নানা গুণ, নানানভাবে সংখ্যা নিয়ে খেলার কৌশল। একই সময়ে তাদের শিক্ষকরা যোগ দেন একটি কর্মশালায় যেখানে শিকক্ষরা গণিত শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের সুপারিশ পেশ করেন। উৎসবের অংশ হিসাবে একই সময়ে আয়োজন করা হয় রামপাল উপজেলা কমিউনিটি ই-সেন্টার উদ্বোধন অনুস্ঠানের। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায় রামপালের এই ই-কেন্দ্রটি চালু করেছে বিজ্ঞান এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। এই সেন্টার থেকে তথ্য ও ই-সেবা প্রদান করা হচ্ছে। বিকেল ৪ টা থেকে স্থানীয় প্রেসক্লাবে আয়োজন করো হয় ‘অপরাধ দমনে তথ্যপ্রযুক্তি’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। প্রেসক্লাবের সভাপতি হেমায়েত হোসেন এতে সভাপতিত্ব করেন। মোস্তফা জব্বারের সঞ্চালনে বৈঠকে অংশ নেন পুলিশ সুপার মীজানুর রহমান, প্রেসক্লাবের সম্পাদক বাবুল সর্দার, বর্ষীয়ান শিক্ষক বুলবুল আহমেদ, বিটিএনের সিইও মাহমুদুল ইসলাম প্রমূখ। যে সময়ে গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছিল সেসময় বাগেরহাট বহুমূখী বিদ্যালয়ের মাঠে ওড়ানো হচ্ছিল ওয়াটার রকেট। বাংলাদেশ এস্ট্রোনমিকাল সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এফ আর সরকারের পরিচালনায় ৫টি রকেট উৎক্ষেপন করা হয়। বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রথমবারের মতো বাগেরহাট জেলায় ওয়াটার রকেট উৎক্ষেপন উপভোগ করে। বিকেল ৬টায় মূল উৎসব মঞ্চে শুরু হয় তথ্য অধিকার নিয়ে রূপান্তরের পট গান। এর পরপরই হয় স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় ‘শিশু চলচ্চিত্র প্রদর্শনী’। প্রদর্শিত হয় তিনটি শিশু চলচ্চিত্র। চিলড্রেন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এতে সহায়তা করে। একই সময়ে প্রসক্লাবে আয়োজন করা হয় ‘মোস্তফা জব্বার সন্ধ্যা’। এই ভাবে শেষ হয় একটি নতুন উৎসবের প্রথম দিন। উৎসবের দ্বিতীয় দিন সকালে বাগেরহাট প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত উইকিপিডিয়ায় বাগেরহাটের তথ্য হালনাগাদকরণ কর্শালঅ অনুষ্ঠিত হয়। কর্মশালায় কিছু সময় অতিবাহিত করেন এর আগে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক, বাগেরহাট-৪ আসনের সাংসদ মোজাম্মেল হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা শেখ আব্দুল কাইয়ুম প্রমূখ। মেয়র বাগেরহাটের আরও বেশি তথ্য উইকিপিডিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে এ কাজ সম্পূর্ণ করতে আয়োজকদের প্রতি আহ্বান জানান। কর্মশালায় জানানো হয় আগামী তিনমাসের মধ্যে বাগেরহাট জেলার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সমূহ বাংলা উইকিপিডিয়াতে সংযোজন করার কাজ শেষ হবে। দুপুরে বাগেরহাট সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে বক্তৃতা করেন খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক, খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হক, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মু. মুয়াজ্জেম হোসাইনসহ আরও অনেকে। এতে তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হয়। মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনার মাধ্যমে ‘স্বপ্নের বাগেরহাট’ শীর্ষক প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. দেলওয়ার হায়দার। বাগেরহাট সরকারি পিসি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের প্রভাষক মো. সিরাজুল ইসলাম ‘ডিজিটাল বাগেরহাট নির্মাণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা’ এবং বাগেরহাট সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো, আফতাব উদ্দিন ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তা: প্রেক্ষিত বাগেরহাট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সেমিনার সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটির সাধারণ সম্পাদক মুনির হাসান। বিকেলে স্বাধীনতা উদ্যানের মূল মঞ্চে গণিত অলিম্পিয়াড, দাবা, সুডোকু ও ক্যারম প্রতিযোগিতায় বিজয়ী ও অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুরস্কার ও সনদ প্রদান করা হয়। গণিত অলিম্পিয়াডের বিজয়ীরা আসন্ন খুলনা বিভাগীয় গণিত প্রতিযোগিতায় সরাসরি অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। সন্ধ্যায় আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন বাগেরহাট সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের শিল্পীরা। |